October 11, 2026, 10:25 pm
সংবাদ শিরোনাম
লোকদেখানো সংস্কৃতি: মানসিক শান্তি ও সামাজিক বন্ধনের অন্তরায় তাড়াশে জমি বিরোধে ঘর ভাঙচুর: প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মিথ্যা লুটপাটের অভিযোগ রাজশাহীতে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতাদের স্বজনদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি তাড়াশে কৃষকের গোয়াল থেকে আড়াই লাখ টাকার গরু চুরি, থানায় অভিযোগ অসুস্থ কনটেন্ট ক্রিয়েটর তাজেলের পাশে সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিন রনি জামালপুরের বকশীগঞ্জে মহা-সড়কে বাস চাপায় একসাথে জীবন গেল পুত্রবধূ ও শ্বাশুড়ির। শনিবার সুরঝংকার একাডেমি খুলনার সম্মাননা স্মারক প্রদান ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তাড়াশে দুর্গোৎসব ঘিরে বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা সভা: ৪৯ মণ্ডপে আর্থিক অনুদানের ঘোষণা তাড়াশে শয্যাশায়ী কিশোর তানজিলের বাঁচার আকুতি বকশীগঞ্জে বিশ্ব দৃষ্টি দিবস উদযাপিত হয়েছে

রাজশাহীতে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতাদের স্বজনদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজশাহীতে সরকারি সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, তাঁদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও অন্যান্য স্বজনদের নামে ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অনুমোদিত তালিকা ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগ রয়েছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পর ডিলার নিয়োগের তালিকা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তালিকা প্রস্তুত ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় পছন্দের ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো আর্থিক লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রাপ্ত তথ্য ও অভিযোগ অনুযায়ী, চারঘাট উপজেলার চারঘাট সদর ইউনিয়নে মেসার্স আলিফ ট্রেডার্সের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন জিনিয়া পারভিন, যিনি উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বুলবুল হোসেনের স্ত্রী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরদহ ইউনিয়নে মেসার্স অথৈয় অ্যান্ড আরিয়া ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ইসরাত জাহানকে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেনের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিমপাড়া ইউনিয়নে মেসার্স দুর্জয় ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী হিসেবে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলামের নাম রয়েছে। ইউসুফপুর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবিনের স্ত্রী সুরভি আক্তার শিখার নাম।

বাঘা উপজেলায় মনিগ্রাম ইউনিয়নে মেসার্স রুবেল ট্রেডার্সের মালিক হিসেবে জেলা বিপ্লবী দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল আলীর নাম উল্লেখ রয়েছে। পাকুড়িয়া ইউনিয়নে মেসার্স জিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক জিয়াউরুলকে ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। বাউসা ইউনিয়নে মেসার্স আতিক ট্রেডার্সের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন পলাশের স্ত্রী জোবাইদা খাতুনের বিরুদ্ধে নয়, বরং তাঁর নামে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। গড়গড়ি ইউনিয়নে মেসার্স রুহি এন্টারপ্রাইজের মালিক হিসেবে যুবদল নেতা আব্দুল মমিনের নাম রয়েছে। আড়ানী পৌরসভায় মেসার্স আসাদুজ্জামান এবং বাঘা পৌরসভায় মেসার্স সাদি এন্টারপ্রাইজের ডিলারশিপ নিয়েও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।

তানোর উপজেলায় তানোর পৌরসভায় মেসার্স মণ্ডল এন্টারপ্রাইজের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন পৌর যুবদলের আহ্বায়ক এমদাদুল হক মণ্ডল বলে উল্লেখ রয়েছে। মুণ্ডুমালা পৌরসভায় মেসার্স বন্ধন এন্টারপ্রাইজের মালিক হিসেবে ফরহাদ কবিরের নাম এসেছে, যিনি পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ কবিরের ভাই বলে দাবি করা হয়েছে। কলমা ইউনিয়নে তানভীর আহমেদ, পাঁচন্দর ইউনিয়নে মেসার্স অহনা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী উম্মুল মোমেনিন খান, সরনজাই ইউনিয়নে মেসার্স শাহনেওয়াজ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শাহনেওয়াজ, চাঁন্দুড়িয়ায় মেসার্স হাজী ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আলাউদ্দিন এবং বাঁধাইড় ইউনিয়নে মেসার্স মর্জিনা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সিদ্দিকা তামান্নার নাম তালিকায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া কামারগাঁও ইউনিয়নে মেসার্স রাদিয়া এগ্রোর স্বত্বাধিকারী হিসেবে উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব শরিফ উদ্দিন এবং তালন্দ ইউনিয়নে মেসার্স বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজের মালিক হিসেবে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল হান্নানের ছেলে ওমর ফারুকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

পুঠিয়া উপজেলায় বেলপুকুর ইউনিয়নে মেসার্স আহসান ট্রেডার্সের মালিক আহসান হাবীব, শিলমাড়িয়া ইউনিয়নে মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাইজের মালিক খাদেমুল ইসলাম, পুঠিয়া সদরে মেসার্স হিমেল ট্রেডার্সের মালিক রিসাব হোসেন কেতাব, জিউপাড়ায় মেসার্স সাঈদ ট্রেডার্সের মালিক মাহাবুর রহমান এবং বানেশ্বরে মেসার্স সরকার এন্টারপ্রাইজের মালিক জাকির হোসেন রাসেলের নাম রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পুঠিয়া পৌরসভায় মেসার্স ফারিশ ট্রেডার্সের মাধ্যমে রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মণ্ডলের নাতজামাই সাহেদ হাসান ডিলারশিপ পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মোহনপুর উপজেলার ঘাসিগ্রাম ইউনিয়নে মেসার্স শাপলা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী হিসেবে উমর ফারুকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি স্থানীয় বিএনপি সভাপতি আব্দুল মালেকের ছেলে বলে দাবি করা হয়েছে। পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নে মেসার্স ইপ্তি এন্টারপ্রাইজের মালিক হিসেবে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে নাঈম ওয়াসিফ এবং হরিয়ানে একটি ট্রেডার্স প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের সঙ্গে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী হোসেনের ছেলে আতিকুর রহমানের নাম জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে।

গোদাগাড়ী উপজেলায় দেওপাড়া ইউনিয়নে মেসার্স বিদ্যুৎ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হিসেবে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক বেদার উদ্দিন বিদ্যুতের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। গোদাগাড়ী পৌরসভায় মেসার্স দুই ভাই ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল্লাহকে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। বাসুদেবপুর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল আলমের ভাই মাইনুল, কাকনহাট পৌরসভায় পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান, গোদাগাড়ী ইউনিয়নে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক শামীম রেজা এবং রিশিকুল ইউনিয়নে ছাত্রদলের সভাপতি হোসেন আল মামুনের নাম ডিলার নিয়োগের তালিকায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

দুর্গাপুর উপজেলার ঝালুকা ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামরুজ্জামান আয়নালের ছেলে ওয়ালিউজ্জামান রওনক, দুর্গাপুর পৌরসভায় জেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক মেয়র সাইদুর মন্টুর ছেলে শাহ আলম সবুজ এবং জয়নগরে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব জুবায়েদ হোসেনের ভাই সাইদুর রহমানের নামে ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত ব্যবসায়িক সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় গুদাম কিংবা সার বিপণনের অবকাঠামো রয়েছে কি না, তা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। তাঁদের আশঙ্কা, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে অযোগ্য বা অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেওয়া হলে সার সরবরাহ ও কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার পাওয়ার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হতে পারে।

তবে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা, গুদামের অবস্থা এবং নিয়োগের শর্ত পূরণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নথি ও সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয় বা আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকাই নিজে থেকে অনিয়মের প্রমাণ নয়; নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা ও বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিই মূল বিষয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে বাগমারা উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার ১৮ জন ডিলারের নিয়োগ প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রয়েছে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আদেশ বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম এবং কমিটির সদস্যসচিব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেনের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।

রাজশাহীর কৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আবেদনকারীদের যোগ্যতা যাচাই, প্রতিষ্ঠানের গুদাম ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা পরিদর্শন এবং লাইসেন্স অনুমোদনের নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষায় ডিলার নিয়োগের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং যোগ্য ব্যবসায়ীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের পেজ লাইক করুন