জাতীয় পর্যায়ের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও/এমএফআই) সম্প্রতি বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা যোগ দিয়েছেন। মাঠপর্যায়ে ঋণ বিতরণ, সাপ্তাহিক কিস্তি আদায় এবং সদস্যদের স্বাবলম্বী করে তোলার পুরো প্রক্রিয়া সামলানোর দায়িত্বে ছিলেন নতুন শাখা ব্যবস্থাপক তানভীর সাহেব। শাখায় যোগদান করার পরপরই দুটি চরিত্র তাঁর বিশেষভাবে চোখে পড়ে।
প্রথমজন আমিনুল—অফিসের ফিল্ড অফিসার। মুখে তার কথার খৈ ফোটে। মাঠের কাজের চেয়ে বসের টেবিলের সামনেই তাকে বেশি সময় দেখা যেত। কখন কাকে তেল দেওয়া লাগবে, কে ফিল্ডে কাজের ফাঁকি দিল, আর কে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে—এসব মুখরোচক গীবত স্যারের কানে তোলাই ছিল তার মূল কাজ। ফিল্ড থেকে ৩-৪ জন সদস্যকে কিস্তি দিতে দেরি করালেই সে এলাকায় বড় রকমের সংকট তৈরি হয়েছে বলে বসকে বোঝাত এবং নিজের সামান্য কাজকে বিরাট সাফল্য হিসেবে জাহির করত। বসের তোষামোদ আর মিষ্টি কথায় সে সবার কাছে এক প্রকার ‘প্রিয়পাত্র’ হয়ে উঠেছিল।
অন্যদিকে ছিলেন জ্যেষ্ঠ ফিল্ড অফিসার আনোয়ার সাহেব। তিনি অফিসে একদম চুপচাপ, শান্ত স্বভাবের একজন মানুষ। সকাল সকাল কালেকশন সীট ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদদ গুছিয়ে তিনি মাঠে নেমে যেতেন। নিয়মিত সমিতি মিটিং করা, প্রান্তিক নারীদের ঋণের সঠিক ব্যবহার শেখানো এবং সঠিক সময়ে কিস্তি ও সঞ্চয় আদায় সম্পন্ন করে নিরবে দিনশেষে অফিস ত্যাগ করে সবার আগে। অফিসে কারও বিরুদ্ধে লাগা বা দলাদলিতে তিনি কখনোই জড়াতেন না।
তাকে দেখে অনেকে হয়তো ভাবত—আনোয়ার সাহেব বোধহয় রাজনীতি বোঝেন না, অফিসের হালচাল বা কে কী গেম খেলছে তা ধরে উঠতে পারেন না। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, আনোয়ার সাহেব মাঠের রাজনীতি থেকে শুরু করে অফিসের ভেতরের সব চালই খুব ভালোভাবে বুঝতেন। তিনি শুধু নিজের ভদ্রতা, নীতি ও পেশাদারিত্ব ধরে রাখতেই নিরব থাকতেন।
ঘটনার শুরু অর্থবছরের শেষ মাসের ক্লোজিংয়ের সময়। ঈদের পর অনেক সদস্যই কিস্তি পরিশোধে দেরি করছিলেন। তানভীর সাহেব তখন চরম চাপে। এই অবস্থায় আমিনুল বড় বড় কথা বলে আশ্বাস দিল যে, সে একা হাতেই সব বকেয়া কিস্তি আদায় করে রেকর্ড গড়ে ফেলবে।
কিন্তু জুন ক্লোজিংয়ের আগের কয়েক দিন দেখা গেল চরম বিপর্যয়! আমিনুলের আওতাধীন সমিতিগুলোতে সুফলন (গরু মোটাতাজাকরণ) প্রকল্পে বকেয়ার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি এবং মাঠে সদস্যদের সাথে তার নানা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। নিজের এই ব্যর্থতা ঢাকতে সে এবার মাঠপর্যায়ে সদস্যদের ওপর এবং সহকর্মীদের অদক্ষতার ওপর দোষ চাপিয়ে ও নানা অজুহাতের পাহাড় দাঁড় করাতে লাগল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে তানভীর সাহেব বাধ্য হয়ে আনোয়ার সাহেবকে ডেকে পাঠালেন।
আনোয়ার সাহেব কিন্তু আমিনুলের ব্যর্থতা নিয়ে কোনো মন্তব্য বা গীবত করলেন না। শান্ত কণ্ঠে শুধু বললেন, “স্যার, দুশ্চিন্তা করবেন না। যে সমিতিগুলোতে সমস্যা আছে, সেগুলোর সদস্যদের সামাজিক পরিস্থিতি আমি আগে থেকেই পর্যবেক্ষণে রেখেছি। মাঠের সম্পর্কটাও ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
পরের দু’দিন আনোয়ার সাহেব কোনো হট্টগোল না করে, নিজের অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ে প্রতিটি বাড়িতে ঘুরে ঘুরে সদস্যদের সাথে কথা বললেন। তাঁর প্রতি সদস্যদের আস্থা এতটাই গভীর ছিল যে, বকেয়া আদায় তো হলোই, সাথে সংস্থার ভাবমূর্তিও রক্ষা পেল। শতভাগ রিকভারি নিয়ে আনোয়ার সাহেব যখন জুন ক্লোজিং নিশ্চিত করলেন, তানভীর সাহেবের চোখ তখন পুরোপুরি খুলে গেল।
তানভীর সাহেব বুঝতে পারলেন—ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে যাঁরা সারাদিন বেশি কথা বলেন, কাজের ফাঁকি দেন এবং বসের আশপাশে ঘুরঘুর করে তেলবাজি করেন, তারা সাময়িকভাবে প্রিয়পাত্র হতে পারে ঠিকই; কিন্তু কঠিন সময়ে তারা সংস্থার জন্য বড় ধরণের ঝুঁকি।
আর আনোয়ার সাহেবের মতো নীরব কর্মীরা যে কিছু বোঝেন না তা নয়; তাঁরা কেবল কাজকে ভালোবাসেন এবং নিজেদের আত্মমর্যাদা ধরে রাখেন। সময় এলে যোগ্য বস ঠিকই চিনে নেন—কারা কথার ফেনা তোলে, আর কারা নীরবে মাঠের আসল ভিত শক্ত রেখে সংস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যায়!
এখানে শিক্ষা হলো দুটি:
১. তোষামোদ ও মুখের কথায় সাময়িক সুবিধা মিললেও, ক্ষুদ্রঋণ বা মাঠপর্যায়ের কাজের আসল ভিত্তি হলো সততা, নীরব কর্মদক্ষতা ও মানুষের আস্থা।
২. নীরবতা মানেই অজ্ঞতা নয়; একজন দায়িত্বশীল মানুষ অহেতুক তর্ক ও গীবত এড়িয়ে নিজের কাজেই যোগ্যতা প্রমাণ করেন।
লেখক: একজন এনজিও কর্মী