
‘চাউল পড়া’ খাইয়ে চুরির অপবাদ ও ফেসবুকে লাইভ করে মানহানি: সিলেটে সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা
গোয়াইনঘাট থেকে রুবেল আহমদের পাঠানো তথ্য ও ভিডিও চিত্রের ভিত্তিতে “সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি ” কবি এস.পি.সেবু’র রির্পোট :
সিলেটের গোয়াইনঘাটে ‘চাউল পড়া’ খাওয়ানোর মতো আদিম ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে এক ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে হেনস্তা ও ফেসবুকে লাইভ করে মানহানি করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী আফতাব উদ্দিন দোলন (৫৭) বাদী হয়ে সিলেট সাইবার ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় আমবাড়ি হাওর এলাকার জালাল উদ্দিনকে প্রধান আসামি করে সাতজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলার অন্য আসামিরা হলেন—জালাল উদ্দিন (৫৫), মিজানুল, আমিনুর, কবির আহমদ, জয়নুল হক এবং আলিম উদ্দিন।
ঘটনার বিবরণ:
মামলার আরজি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ মার্চ ২০২৬ইং তারিখ রাতে অভিযুক্ত মিজানুল ও আমিনুর এর পিতা আব্দুল খালিকের ঘর থেকে টাকা ও মোবাইল চুরি হয়। চোর শনাক্ত করতে সকালে আসামিদের বাড়ির উঠানে এক সালিশ বৈঠক ডাকা হয়। সেখানে এক তান্ত্রিকের কাছ থেকে আনা ‘চাউল পড়া’ উপস্থিত সবাইকে খেতে দেওয়া হয়। আসামিরা দাবি করেন, যার মুখে এই চাল আটকে যাবে সেই চোর। একপর্যায়ে কোনো প্রমাণ ছাড়াই আফতাব উদ্দিন দোলনকে চোর সাব্যস্ত করা হয়। শুধু তাই নয়, দোলনকে অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে ১নং আসামি জালাল উদ্দিন তার ফেসবুক আইডি থেকে পুরো ঘটনাটি লাইভ প্রচার করেন। ওই ভিডিওর কমেন্টে আসামিরা দোলনকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে নানা মন্তব্য করেন। ২য় দফায় ২৮ মার্চ সকালে আসামিরা দোলনকে হত্যার উদ্দেশ্যে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করেন এবং চুরির টাকা ফেরত না দিলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে মারধর করেন যা দোলনের অভিযোগে পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য:
ভুক্তভোগী আফতাব উদ্দিন দোলন বলেন, “আমি একজন নিরীহ কৃষক। চুরির ঘটনাটি রাতে ঘটে। আমি বাড়িতে ছিলাম। সকালে আব্দুল খালিকের ছেলে মিজানুল আমাকে তাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য বলে, আমি তাদের বাড়িতে যাই এবং যাওয়ার পরে তারা আমাকে তাদের ঘরের চুরির ঘটনা বলে ও দেখায় এবং আমি দেখি। তখন তারা আইনের আশ্রয় নিতে বলে। আমি তাদের বলি এতে আমার কোন সহযোগিতা লাগলে আমি করবো। এর পর আমি সেখান থেকে চলে আছি। পরেরদিন সকালে আবার তারা আমাকে তাদের বাড়িতে ডাকে এবং আমি যাই। গিয়ে দেখি তাদের বাড়ির উঠানে অনেক মানুষ বসে আছে। একপর্যায়ে উপস্থিত মুরব্বি ও সমাজের সামনে চুর সাব্যস্থ করতে আদিম ও কুসংস্কার প্রথা চাউল পড়া খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত হলে সামনে থাকা কয়েকজন চাউল খায় আমাকে ও খেতে বলা হয়। আমিও খাই। সিদ্ধান্ত হয় যার মুখে চাউল আটকে যাবে সে চুর সাবস্থ্য হবে। আমি অসুস্থ অপারেশনের রোগী হওয়ায় আমার গলা শুকনা থাকে। বিচারের একপর্যায়ে আমাকে দোষী বানিয়ে বলা হয় তুমি আগামী দুইদিনের মধ্যে চুরি হওয়া মোবাইল ও টাকা দিয়ে দিবে। আমি রাজি হইনি। জোর করে আমাকে বিষয়টি সমাধানের জন্য আমার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে দুই একজন মুরব্বি আমাকে বলে ১৫/২০ হাজার টাকা দিলে বিষয়টি সমাধান করে দিবে। কিন্তু আমি দিতে রাজি হই নাই,কারণ আমি ত চুর না। এখানে উল্টোভাবে আমার উপর দোষ চাপানো হচ্ছে। আমি নাকি মুরব্বিদের টাকা দিয়ে বিষয়টি সমাধান করার কথা বলেছি। মুরব্বিরা টাকা চেয়েছে, আমি টাকা দিতে রাজি হইনি। পরিকল্পিতভাবে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। চাউল পড়ার মতো বেআইনি ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে আমাকে সমাজের সামনে চোর সাজানো হয়েছে। আমি দেশবাসী ও প্রশাসনের কাছে এই অপমানের সুষ্ঠু বিচার চাই।”
তদন্ত ও স্থানীয়দের ভাষ্য:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দোলন এই চুরির ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সম্ভাবনা নেই। স্থানীয় মুরুব্বি ইসমাইল মিয়া জানান, “চাউল পড়া খাওয়ানোর সময় আমি তান্ত্রিককে হাজির করতে বলেছিলাম, কিন্তু আসামিরা তা শোনেনি। দোলন একজন ভালো মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিত।” স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, পূর্ব শত্রুতার জেরে জালাল উদ্দিন পরিকল্পিতভাবে এই নাটক সাজিয়েছেন।
আসামি পক্ষের দাবি:
প্রধান আসামি জালাল উদ্দিন দাবি করেন, দোলন বিষয়টি মীমাংসার জন্য মুরব্বীদের মাধ্যমে টাকা দিতে চেয়েছিলেন, যা তার অপরাধের প্রমাণ। তবে দোলন এই দাবি অস্বীকার করে বলেছেন, মুরুব্বিরা তাকে চাপ দিচ্ছিলেন ঝামেলা মিটিয়ে নিতে, কিন্তু তিনি চোর না হওয়ায় টাকা দিতে রাজি হননি।
আইনি পদক্ষেপ:
মামলার আরজিতে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ২৫ ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩২৩/৩৫৫/৫০৬(২)/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। বিজ্ঞ আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
সামাজিকভাবে মানহানি ও শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়ে ভুক্তভোগী দোলন বর্তমানে বিচারপ্রার্থী। সচেতন মহল এই আধুনিক যুগেও ‘চাউল পড়া’র মতো কুসংস্কার ব্যবহার করে মানুষকে হেনস্তা করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও সুষ্ঠু বিচারের দাবী জানিয়েছেন।

