June 23, 2026, 6:33 am
সংবাদ শিরোনাম
কাগজে স্বাধীনতা, বাস্তবে শৃঙ্খল: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত? বাংলাদেশ ভূমিহীন ও গৃহহীন হাউজিং লিমিটেডের প্রতিনিধি সম্মেলন-২০২৬ অনুষ্ঠিত যুক্তরাজ্য নর্থহ্যাম্পটনের মেয়র কর্তৃক ‘অনুপ্রেরণাদায়ক’ কমিউনিটি লিডার সম্মাননায় ভূষিত নানিয়ারচর সেনা জোনের উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত উত্তরার বিডিআর মার্কেটের পার্কিং স্থান নিয়ে বিরোধ: পুরো মার্কেটকে ঘিরে আদালতে তিন মামলা, উত্তেজনা বৃদ্ধি তেঘরি গ্রামে গাছ কর্তন ও রাস্তা, সাইনবোর্ড ভাঙচুর মামলায় ৮ আসামি কারাগারে প্রবাসীর খোলা চিঠি : রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সমীপে লন্ডনে এনসিপি মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহর সঙ্গে বিশ্বনাথ পৌর নেতা ইকবাল হোসেনের সৌজন্য সাক্ষাত সিংগাইরে মানবতার হাত বাড়াল সাত্তার ফাউন্ডেশন: ১৫ পরিবার পেল ১৫ লাখ টাকা সিলেটের জৈন্তাপুরে যুবদল নেতা পরিচয়ে ‘ব্রয়লার সেলিম’ সিন্ডিকেটের দাপট ঐতিহাসিক রাজবাড়ী ও মিনি স্টেডিয়াম ঘিরেও নানা অনিয়মের অভিযোগ।

কাগজে স্বাধীনতা, বাস্তবে শৃঙ্খল: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত?

“কাজীর গরু গোয়ালে নেই, আছে শুধু কাগজে”—বাংলা ভাষার এই বহুল প্রচলিত প্রবাদটি আজকের বাস্তবতায় নতুন মাত্রা পেয়েছে।

বিশেষ করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে এ কথাটি যেন এক নির্মম সত্যের প্রতিচ্ছবি।

সংবিধান, আইন, নীতিমালা ও রাষ্ট্রীয় ঘোষণায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকারের কথা উচ্চারিত হলেও বাস্তবে সত্য প্রকাশের পথ প্রায়ই হয়ে ওঠে কণ্টকাকীর্ণ।

কাগজে ঘোষিত স্বাধীনতা আর মাঠের বাস্তবতার এই ব্যবধান গণতন্ত্র, সুশাসন এবং নাগরিক অধিকারের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।

গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও অনিয়ম উন্মোচন করা এবং জনগণের কণ্ঠস্বরকে সামনে আনা। স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া কোনো গণতন্ত্র দীর্ঘদিন টেকসই হতে পারে না। কারণ জনগণ যদি সত্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তাদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও ক্ষুণ্ন হয়।

সংবাদমাধ্যমের প্রকৃত শক্তি সত্য ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের পর অনেক সাংবাদিককে মামলা, আইনি নোটিশ, প্রশাসনিক চাপ, সামাজিক হুমকি কিংবা নানামুখী হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। কখনো ব্যক্তি, কখনো প্রতিষ্ঠান, আবার কখনো ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর অসন্তোষের কারণে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এর ফলে শুধু একজন সাংবাদিক নয়, পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’-এর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যও আমাদের স্বীকার করতে হবে—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে সাংবাদিকদের আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান নয়। সাংবাদিকতারও রয়েছে নৈতিকতা, পেশাগত মানদণ্ড ও জবাবদিহি। মিথ্যা তথ্য, অপপ্রচার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ বা মানহানিকর প্রচারণা কখনোই স্বাধীনতার অংশ হতে পারে না। কিন্তু তথ্য-প্রমাণনির্ভর ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশের কারণে যদি সাংবাদিকদের ভয়ভীতি, মামলা বা হয়রানির মুখে পড়তে হয়, তাহলে তা স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশকে দুর্বল করে এবং গণতন্ত্রের ভিতকে নড়বড়ে করে দেয়।

এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—সাংবাদিকতা কি রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকতে পারছে?

বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পদধারী ব্যক্তিরা সাংবাদিকতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যখন একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের শিকার হলে সেটিকে সাংবাদিকতার ওপর আঘাত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা প্রকৃত সাংবাদিকদের আন্দোলন ও দাবিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাস্তবতা হলো, রাজনীতি করার অধিকার যেমন সবার আছে, তেমনি সাংবাদিকতারও রয়েছে নিজস্ব নৈতিক অবস্থান। কিন্তু একজন ব্যক্তি যদি সক্রিয়ভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের পদ-পদবিতে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাঁর সংবাদ পরিবেশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। এ কারণেই অনেকের কণ্ঠে আজ একটি প্রশ্ন উচ্চারিত হচ্ছে—”রাজনীতি করবেন, নাকি সাংবাদিকতা করবেন?”

কারণ রাজনৈতিক আনুগত্যে আবদ্ধ সাংবাদিকতা কখনোই জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে না। সাংবাদিকের প্রথম ও প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে; কোনো দল, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার বলয়ের মুখপাত্র হিসেবে নয়। সাংবাদিকের কলম দলীয় স্বার্থের নয়, রাষ্ট্র ও জনতার স্বার্থের পক্ষে কথা বলবে—এটাই প্রত্যাশা।

ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহের গতি অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সাংবাদিকতার বিস্তারে তথ্য এখন মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে ভুয়া খবর, গুজব ও অপতথ্যের ঝুঁকি। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তেমনি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের দাবি নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। একজন সাংবাদিক যখন দুর্নীতি, অনিয়ম বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করেন, তখন তিনি মূলত জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করেন। ফলে সংবাদমাধ্যমের ওপর অযৌক্তিক চাপ মানে জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা। যে সমাজে সত্য চাপা পড়ে, সেখানে গুজব জন্ম নেয়; যেখানে তথ্য অবরুদ্ধ হয়, সেখানে অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়।

বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নয়, বরং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে দেখা হয়। সেখানে সাংবাদিকরা সরকারের সমালোচনা করতে পারেন, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন এবং জনস্বার্থে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেন। কারণ সমালোচনা গণতন্ত্রের শত্রু নয়; বরং গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার অন্যতম উপাদান। যে সমাজে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে না, সেখানে জবাবদিহিও প্রতিষ্ঠিত হয় না।

একই সঙ্গে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাও অপরিহার্য। তথ্য যাচাই, একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানো এবং পেশাগত নীতিমালা অনুসরণ করা সাংবাদিকতার মৌলিক শর্ত। স্বাধীনতা ও দায়িত্ব—এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম।

আজ প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে সত্য অনুসন্ধান করতে পারবেন, আবার একই সঙ্গে পেশাগত নৈতিকতার প্রতিও দায়বদ্ধ থাকবেন। প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে সমালোচনাকে শত্রুতা নয়, উন্নয়নের সহায়ক হিসেবে দেখা হবে। কারণ সত্যকে আড়াল করে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা কোনো রাষ্ট্র বা সমাজের জন্য কল্যাণকর নয়।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যদি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেটি প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন সত্য প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিককে ভয়, মামলা বা হয়রানির আশঙ্কায় দিন কাটাতে হবে না; যখন জনগণের জানার অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে; এবং যখন রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের অংশীদার হিসেবে কাজ করবে।

গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য পরিমাপের অন্যতম মানদণ্ড হলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। তাই স্বাধীনতা শুধু কাগজে নয়, বাস্তবেও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সত্যকে ভয় নয়, সত্যকে গ্রহণ করার সাহসই একটি রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক করে তুলতে পারে।

সত্যকে রুদ্ধ করে কোনো জাতি এগোয় না; সত্যকে ধারণ করেই এগিয়ে যায় সভ্যতা।

লেখক: মোঃ মাহিদুল হাসান সরকার
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেস ক্লাব (B.C.P.C) কেন্দ্রীয় কমিটি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের পেজ লাইক করুন