চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আজাদী বাজার জোনাল অফিসের বিরুদ্ধে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ
নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ আদায়, মিটার স্থানান্তরে বিলম্ব, লোড অনুমোদন ও ট্রান্সফরমার স্থাপনে অনিয়মের অভিযোগ; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি গ্রাহকদের।
ফটিকছড়ি চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আওতাধীন আজাদী বাজার জোনাল অফিসের বিভিন্ন সেবা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, হয়রানি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেনের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ, মিটার স্থাপন ও স্থানান্তর, লোড বৃদ্ধি, ট্রান্সফরমার এবং এইচটি লাইন নির্মাণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কাছ থেকে নির্ধারিত নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, পল্লী বিদ্যুতের প্রচলিত নিয়ম ও নির্ধারিত ফি অনুসরণ করে সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও আজাদী বাজার জোনাল অফিসের কিছু কার্যক্রমে গ্রাহকদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ও নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে।
নতুন সংযোগ ও মিটার স্থাপনে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ:
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ গ্রহণের সময় মিটার, সকেট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মূল্য বাবদ কোনো কোনো গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ২৯ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এসব অর্থের পরিমাণ সরকারি নির্ধারিত মূল্য ও বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া প্রিপেইড মিটার পরিবর্তন ও সংশ্লিষ্ট সেবার নির্ধারিত ফি নিয়েও গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। পূর্বনির্ধারিত ফির পরিবর্তে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
মিটার স্থানান্তরে দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির অভিযোগ:
পুরোনো মিটার স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহকদের দাবি, নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন মিটার স্থানান্তর করা হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং বিভিন্ন অজুহাতে গ্রাহকদের হয়রানি করা হচ্ছে।
পাশাপাশি মিটার স্থানান্তরের সময় সার্ভিস ড্রপ তার ও অন্যান্য উপকরণের প্রয়োজনীয় পরিমাণের চেয়ে বেশি উপকরণ ও অর্থ গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
লোড বৃদ্ধি ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা:
বিদ্যুতের লোড বৃদ্ধির আবেদন করার পর সরেজমিন পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া সত্ত্বেও কোনো কোনো গ্রাহককে সংযোগ পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুমোদিত লোড থাকা সত্ত্বেও নতুন করে বিভিন্ন শর্ত আরোপ কিংবা অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ট্রান্সফরমার ও এইচটি লাইন স্থাপনে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ:
কৃষি খামার, পোল্ট্রি ফার্ম, ডেইরি ফার্ম ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে ট্রান্সফরমার ও এইচটি লাইনের প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের সরেজমিন পরিদর্শনের পর তুলনামূলক কম দূরত্বে সংযোগ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, অতিরিক্ত খুঁটি ও তার স্থাপন এবং ট্রান্সফরমার ক্রয়ের জন্য গ্রাহকদের নিজস্ব অর্থ ব্যয়ের কথা বলা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত নিয়ম ও বিদ্যুৎ বিতরণ নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
এজিএমের দায়িত্ব পালন নিয়ে অভিযোগ:
আজাদী বাজার জোনাল অফিসের এজিএম কম. মনিরুজ্জামানের দায়িত্ব পালন ও বিভিন্ন সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন গ্রাহক।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথিত অনৈতিক আর্থিক লেনদেন বা বিশেষ সমঝোতা না হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে থ্রি-ফেজ ও সিঙ্গেল-ফেজ শিল্প সংযোগ পেতে গ্রাহকদের সমস্যায় পড়তে হয়।
এ ছাড়া সোলার ব্যবস্থা কিংবা ট্রান্সফরমার প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরঞ্জাম ক্রয়ে গ্রাহকদের উৎসাহিত কিংবা বাধ্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পে সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন:
মাথাভান্ডার, আমতলী, চাড়ালিয়া গার্ডের পূর্ব পাশে অবস্থিত প্রায় ৮০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পোল্ট্রি/ডেইরি ফার্মে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
এ ছাড়া নানুপুর সোনালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সোলার ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম, স্বার্থের সংঘাত কিংবা আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি:
অভিযোগকারী কাজী ফারুক আহমেদ চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, অভিযোগগুলোর প্রতিটি বিষয় সরেজমিনে তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং ভুক্তভোগী গ্রাহকদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। তদন্তে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অভিযোগকারীর মতে, তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে এবং বিদ্যুৎ সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।