স্টাফ রিপোর্টার
দেশে চলমান জ্বালানি সংকটের তীব্র আঁচ লেগেছে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ক্ষুদ্রঋণ খাতে। তেলের দামবৃদ্ধি এবং সহজলভ্যতার অভাবে মাঠ পর্যায়ে ঋণ বিতরণ ও কিস্তি সংগ্রহের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার মাঠকর্মী এবং ক্ষুদ্র ঋণের ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক গ্রাহকেরা।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন না হলে এই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে পুরো ব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে আসতে পারে।
সরেজমিনে দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) কার্যক্রমের একটি বড় অংশই মাঠকর্মীদের গতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি সমিতিতে গিয়ে কিস্তি সংগ্রহ, নতুন গ্রাহক জরিপ এবং সদস্যদের সঙ্গে সভা করার জন্য কর্মীদের মোটর সাইকেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট এবং চড়া দাম তাদের এই চলাচলকে সীমিত করে দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শীর্ষস্থানীয় এনজিও-র মাঠকর্মী বলেন, “আমাদের প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার পথ চলতে হয়। তেলের যে দাম, তা এখন আমাদের বেতনের একটি বড় অংশ খেয়ে ফেলছে। আবার অনেক সময় পাম্পে গিয়ে তেল পাওয়া যায় না। এতে আমাদের কাজ পুরোপুরি থমকে যাচ্ছে। আমরা সময়মতো কিস্তি সংগ্রহ করতে পারছি না, যা আমাদের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।”
আবার এই সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে গ্রাহকদের ওপরও। অনেক ক্ষেত্রে মাঠকর্মীরা সময়মতো সমিতিতে না পৌঁছাতে পারায় সদস্যরা কিস্তি পরিশোধে অসুবিধায় পড়ছেন। দীর্ঘ মেয়াদে এটি সদস্যদের শৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে এবং ঋণ খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ক্ষুদ্রঋণ বা এমএফআই খাতকে টিকে থাকতে হলে একটি কার্যকর ও টেকসই বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দ্রুত নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সম্ভাব্য সমাধানের পথ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন:
১. ডিজিটাল লেনদেনের সম্প্রসারণ: মাঠকর্মীদের সরাসরি টাকা লেনদেনের চাপ কমাতে হবে। সদস্যদের মধ্যে বিকাশ, নগদ বা অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারের মাধ্যমে কিস্তি পরিশোধের অভ্যাস গড়ে তোলা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর জন্য সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এতে সরাসরি যোগাযোগের চাপ কমবে এবং সময় ও জ্বালানি উভয়ই সাশ্রয় হবে।
২. পরিবহন ব্যবস্থার বিকল্প ব্যবহার: মাঠকর্মীদের জন্য মোটর সাইকেলের পরিবর্তে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা বৈদ্যুতিক স্কুটার ব্যবহারের অনুমোদন ও উৎসাহ প্রদান করা যেতে পারে। যেখানে সম্ভব, নিকটবর্তী কেন্দ্রগুলোতে যাতায়াতের জন্য বাইসাইকেল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. ভাতা কাঠামোর পুনর্বিন্যাস: বর্তমানে কর্মীদের জন্য প্রদত্ত জ্বালানি (তেল) ভাতা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এই ভাতাকে অটোরিকশা ভাড়া বা ব্যাটারি চার্জিং খরচ বাবদ ভাতা হিসেবে রূপান্তর করা যেতে পারে। প্রয়োজনে দূরত্বভিত্তিক ভাতা নির্ধারণ করতে হবে।
৪. সদস্যদের উদ্বুদ্ধকরণ: সংকটকালীন সময়ে সদস্যদের নিয়মিত কেন্দ্রভিত্তিক সময়মতো কিস্তি পরিশোধের গুরুত্ব বুঝিয়ে দায়বদ্ধতা বজায় রাখতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে ছোট সভা বা মিটিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।
ক্ষুদ্রঋণ খাতের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য এই বিকল্প ব্যবস্থাগুলোর কার্যকর প্রয়োগ ও নিয়মিত মনিটরিং অত্যন্ত জরুরি। সময়ের প্রেক্ষাপটে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উদ্ভাবনী চিন্তা না করলে জ্বালানি সংকটের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এমএফআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি নিজেদেরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।