মোঃ মহিউদ্দিন বাবু
ঢাকা বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান বাংলাদেশ:-
রাজধানী ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়া বাজারের পূর্ব পাশে সিরাজের ইটভাটার দক্ষিণে গড়ে উঠেছে দুটি অবৈধ সীসা উৎপাদন কারখানা। এসব কারখানায় পুরাতন ব্যাটারি আগুনে পুড়িয়ে সীসা উৎপাদন করা হচ্ছে, যা স্থানীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের পরিবেশগত অনুমোদন ছাড়াই কারখানাগুলোতে পুরাতন ব্যাটারি ভেঙে ভেতরের সীসা আলাদা করে আগুনে গলিয়ে পুনরায় সীসা তৈরি করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া আশপাশের পরিবেশ দূষিত করছে এবং কৃষিজমি, গাছপালা ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অভিযোগ রয়েছে, কারখানা দুটির মালিক গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার মোঃ শাজাহান আলী, মোঃ মহসিন, মোঃ আলমগীর হোসেন ও মোঃ মিলন মিয়া। স্থানীয়দের দাবি, তারা দীর্ঘদিন ধরে রাতের আঁধারে পুরাতন ব্যাটারি জ্বালিয়ে সীসা উৎপাদন করে আসছেন।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কারখানা দুটিতে মোট চারটি চুলা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চুলার পাশে শ্রমিকরা পুরাতন ব্যাটারির প্লেট কেটে আলাদা করে স্তূপ করে রাখছিলেন। জানা যায়, রাতে কাঠ ও কয়লার আগুনে এসব প্লেট জ্বালিয়ে সীসা উৎপাদন করা হয়। কারখানার আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ব্যাটারির ভাঙা অংশ, অ্যাসিডযুক্ত মাটি এবং কালো ধোঁয়ার চিহ্ন সহজেই চোখে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দিনের তুলনায় রাতেই এসব কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বেশি চলে। কারণ, রাতের বেলায় ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ তুলনামূলক কম চোখে পড়ে এবং প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কাজ করা সহজ হয়। রাতভর জ্বলতে থাকা চুলা থেকে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে, যার ফলে শিশু, নারী ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা ও নানা শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি অভিযোগ করেন, পুরাতন ব্যাটারি পোড়ানোর ফলে যে ধোঁয়া নির্গত হয় তা অত্যন্ত বিষাক্ত। এতে সীসা, অ্যাসিড ও ভারী ধাতব পদার্থ বাতাসে মিশে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন সীসার সংস্পর্শে থাকলে কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র, ফুসফুস ও রক্তের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও বর্জ্য আশপাশের জমিতে পড়ছে, যার ফলে মাটির উর্বরতা কমে যেতে পারে। বৃষ্টির সময় এসব রাসায়নিক পদার্থ পানির সঙ্গে মিশে খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রবেশ করলে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে।
পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের অবৈধ সীসা উৎপাদন কারখানা শুধু পরিবেশ আইন লঙ্ঘনই নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে এক নীরব অপরাধ। তারা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কারখানাগুলো চালু থাকলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে মালিকপক্ষ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এলাকাবাসী। তারা অবিলম্বে অবৈধ কারখানা বন্ধ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানা পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি। বিশেষ করে পুরাতন ব্যাটারি থেকে সীসা আহরণের সময় নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে তা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে।
কারখানার মালিক মোঃ শাজাহান আলী ও মোঃ মহসিন আলীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করেই কারখানা পরিচালনা করা হচ্ছে। বর্তমানে কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, তবে ঈদের পর পুনরায় চালু করা হবে। তারা বলেন, “নিউজ করে পারলে কিছু করবেন।”
এলাকার সচেতন মহল অবিলম্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ সীসা কারখানা দুটি উচ্ছেদ করতে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সাভার উপজেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের সুস্থ জীবন রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—অন্যথায় ভবিষ্যতে এই অঞ্চল ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & imo 01886833283
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন (আর্তমানবতার সেবায়) নগদঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩