আওরঙ্গজেব কামালঃ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্রুত ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা ভেঙে নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে, দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক মাঠে জমে উঠছে প্রতিযোগিতা, বাড়ছে গণসংযোগ ও প্রচার কার্যক্রম। একই সঙ্গে দলবদল, জোট পুনর্বিন্যাস, আসন সমঝোতা এবং নেতৃত্বের অবস্থান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাজনীতির প্রচলিত সমীকরণ নতুন রূপ নিচ্ছে। গত প্রায় দেড় দশকে ক্ষয়প্রাপ্ত গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনরুজ্জীবিত করতে বর্তমান সরকার দৃশ্যত সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্নও উঠছে। হাদি, খুলনার সাংবাদিক ইমদুল হক মিলনসহ একাধিক নিরপরাধ মানুষের হত্যাকাণ্ড জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে নির্বাচনমুখী রাজনীতির অগ্রযাত্রা কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে—সে প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া এখনো কিছু পুলিশ তার ঘুষ বন্ধ করেনি বরং আগের চেয়ে যেন বাড়িয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে একই কথা প্রশাসন এখনো তার সভাব পরিবর্তন করেনি। এখনো সাংবাদিক লাঞ্চিত হচ্ছে মিথ্যা মামলায় সাংবাদিক গ্রেফতার হচ্ছে। তবুও আমি বলবো কিছুটা হলেও দেশের মধ্যে যেন সার্বিক বিষয়ে পরিবর্তনের আভাস পাচ্ছি। সে যায় হোক নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সমমনা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে যোগদান রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছে। এতে একদিকে যেমন বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি বেড়েছে, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক বলয়েও নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এবার ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে নতুন কৌশল ও সমঝোতার পথে এগোচ্ছে—যা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন মাঠে সংগঠিতভাবে কাজ করার দাবি থাকলেও জামায়াতে ইসলামী প্রত্যাশিত মাত্রায় রাজনৈতিকভাবে গুছিয়ে উঠতে পারেনি। দলটি আগেই ৩শ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করলেও বাস্তব রাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে তাদের অবস্থান কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর রাজনৈতিক চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোটি মানুষের সামনে দেওয়া তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বার্তা ও নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে নির্বাচনের রাজনীতি আগের তুলনায় অনেক বেশি বহুমাত্রিক ও জটিল। বিএনপি ইতোমধ্যে তার রাজনৈতিক শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে একটি আসন দেওয়া হয়েছে। একই দলের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন এবং কৌশলগত কারণে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। যুগপৎ আন্দোলনের শরিক সাতটি দলের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে বিএনপি আরও আটটি আসন ছেড়ে দিয়েছে। গত বুধবার গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব তথ্য জানান। যেসব আসনে শরিকদের ছাড় দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো—বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না,নড়াইল-২ আসনে এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ,যশোর-৫ আসনে ইসলামী ঐক্য জোটের মুফতি রশিদ বিন ওয়াক্কাস,পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর,ঢাকা-১২ আসনে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক,ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি।এ ছাড়া পিরোজপুর-১ আসনে শুরুতে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) নেতা মোস্তফা জামাল হায়দারকে ছাড় দেওয়া হলেও পরবর্তীতে সেখানে বিএনপি অধ্যাপক আলমগীর হোসেনকে প্রার্থী ঘোষণা করে। এদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ ৮ দলীয় জোটের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক জোট নিয়ে দলটির অভ্যন্তরেই অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ৩০ জন সদস্য আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে লিখিত চিঠি দিয়েছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দলটির যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন। পাশাপাশি ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা। তিনি ইতি মধ্যে তার দল এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। ফলে রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ যেন অন্য রকম রুপে সাজতে শুরু করেছে।মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। নির্বাচনী প্রচার ধীরে ধীরে গতি পাচ্ছে। জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে, যা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও বহুমাত্রিক করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন—গণঅধিকার পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা এবং এলডিপির একাংশের চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম। গত ২৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন রাশেদ খান। সব মিলিয়ে বলা যায়, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রচলিত সমীকরণ দ্রুত বদলে গেছে। ২৫ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রে ছিল—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশে ফিরবেন কি না। ১২ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও জনমনে নানা প্রশ্ন ছিল—ভোট আদৌ হবে কি না, অনেকে এখনো বলেছেন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী২০২৬ ত্রয়োদশ নির্বাচন হবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে কি না, সহিংসতা ও অস্থিরতা থামবে কি না। কিন্তু প্রায় ১৭ বছর পর তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন এবং জনসমুদ্রে দেওয়া তাঁর বক্তব্য রাজনীতির গতিপথ আমূল পাল্টে দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য ছিল ভিন্ন মাত্রার, ভিন্ন বার্তার এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতার স্পষ্ট ইঙ্গিতবাহী।এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক আয়োজন নয়—বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাবিন্দু হয়ে উঠতে চলেছে।এদিকে শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেছেন, প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তিনি জানান, ফ্যাসিবাদী শক্তি আসন্ন নির্বাচনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, তবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকার একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করবে। যারা নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা করবে, তাদের কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। উপদেষ্টা আরও বলেন, বাংলাদেশের কোনো দেশপ্রেমিক মানুষই নির্বাচন নিয়ে সংশয় পোষণ করবে না; বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সরকারকে সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশাও বদলাচ্ছে। শুধু স্লোগান বা বক্তব্য নয়, মানুষ এখন কার্যকর গণতন্ত্র, জবাবদিহিমূলক সরকার, সুশাসন ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে বেশি সচেতন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নাগরিক পরিসরে এই চাহিদার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।রাজনীতির এই পরিবর্তিত সমীকরণে নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোন দল কার সঙ্গে যাবে, কোথায় সমঝোতা হবে, কোথায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা—এসব বিষয় এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ফলে রাজনীতির মাঠে এক ধরনের নীরব পুনর্বিন্যাস চলছে, যা আগামী দিনে দৃশ্যমান রূপ নিতে পারে।সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের রাজনীতি একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বদলে যাওয়া এই সমীকরণ শুধু দলীয় কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ও জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লেখক ও গবেষক : আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি, ঢাকা প্রেস ক্লাব ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 0044 7574 879654
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন (আর্তমানবতার সেবায়) নগদঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩