আওরঙ্গজেব কামালঃ দেশ আজ এক গভীর রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। সামনে দ্বারপ্রান্তে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—যা কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশ গ্রহণমূলক হবে—তা নিয়ে জনমনে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ, সংশয় ও অনিশ্চয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে উচ্ছৃঙ্খল জনতা মব সৃষ্টি করে সহিংস হামলা, ভাঙচুর এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ চালাচ্ছে। এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এগুলো রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। প্রতিনিয়ত দেশে হত্যা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম ক্রমাগত বেড়েই যাওয়ার জনমনে নানাবিধ আত্নঙ্ক দেখাদিয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে নির্বাচনের পরিবেশ ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে—যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। দেশের মানুষ দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে কার্যকর ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। জনগণ আজ ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে, তারা চায় তাদের মতামতের প্রতিফলন হোক রাষ্ট্র পরিচালনায়। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করার জন্য একটি স্বার্থান্বেষী চক্র পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে—এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এই অপচেষ্টা প্রতিহত করতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিশেষ নজরদারি, কঠোর অবস্থান ও দায়িত্বশীল ভূমিকা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। এদিকে বিএনপি'র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দেশে ফিরছেন । সে বিষয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে অন্যরকম এক সমীকরণ। এদিকে তারেক রহমানের নিরাপত্তা বিষয়ক সরকার কঠোর নজরদারির চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে ভারতের দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের কনসুলার সেবা ও ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সোমবার দিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক নোটিশে এই তথ্য জানানো হয় এবং এর জন্য দুঃখপ্রকাশও করা হয়। কূটনৈতিক অঙ্গনে এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ও ভারতের প্রতি বাংলাদেশের জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া নির্বাচনকালীন পরিবেশকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অনেকের মতে, ভারতের বিরোধী মনোভাব ও নানা চক্রান্ত আগামী জাতীয় নির্বাচনকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে গভীর অবিশ্বাস ও চরম মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচনকে ঘিরে আশঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন, সরকারের কঠোর অবস্থান, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতি—সব মিলিয়ে একটি জটিল ও স্পর্শকাতর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ড, সাংবাদিক নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ নতুন মাত্রা পেয়েছে।গণতন্ত্রের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো জনগণের ভোটাধিকার এবং সেই ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য একটি নিরাপদ, নির্ভীক ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, মামলা-গ্রেপ্তার, সভা-সমাবেশে বাধা এবং ভিন্নমত দমনের অভিযোগ গণতান্ত্রিক চর্চাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। যখন ভোটের মাঠে সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ ও সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, তখন নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।আরও উদ্বেগজনক হলো দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার ঘটনায় জনজীবনে ভয় ও অনিশ্চয়তা নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক কর্মী, নাগরিক ও সাংবাদিক হত্যার ঘটনা শুধু অপরাধ নয়—এগুলো রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা, সুশাসন ও আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত। যেখানে নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, সেখানে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করা সরকারের জন্য যে কঠিন চ্যালেঞ্জ—তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এদিকে একটি পক্ষ দেখতে পাচ্ছে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তাদের সক্ষমতা ও ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। কমিশনের ওপর সরকারের প্রভাব রয়েছে—এমন ধারণা দূর করতে না পারলে আসন্ন নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক ও অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে উঠবে।ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের লড়াই নয়; এটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে। সরকার যদি সত্যিই গণতন্ত্র রক্ষার অঙ্গীকারে বিশ্বাসী হয়, তবে তাকে অবশ্যই একটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—বিতর্কিত নির্বাচন কখনো স্থিতিশীলতা আনে না; বরং তা রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। তাই সময় থাকতেই সরকারকে সংলাপ, সহনশীলতা ও সমঝোতার পথে হাঁটতে হবে। জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারই হতে পারে এই সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ। শেষ পর্যন্ত বলতে হয়, গণতন্ত্র কোনো একক দলের সম্পত্তি নয়—এটি জনগণের অধিকার। সেই অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে তার দায় ইতিহাস ক্ষমা করবে না। আজ এই সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করার সময় এসেছে। একই সঙ্গে দেশের বিরুদ্ধে যারা চক্রান্ত করছে, তাদের প্রতিহত করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই।
লেখক ও গবেষকঃ
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি
ঢাকা প্রেস ক্লাব
ও
আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 0044 7574 879654
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন (আর্তমানবতার সেবায়) নগদঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩