মোহাম্মদ রাসেল মির্জা : স্টাপ রিপোর্ট
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা নির্বাচন অফিসার সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে সেবাগ্রহীতাদের নানাভাবে হয়রানি, ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং একচোখা আচরণের মাধ্যমে রমরমায় ঘুষ বাণিজ্য চালানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট নীতিমালা তোয়াক্কা না করে, সম্পূর্ণ নিজস্ব খেয়ালখুশি ও 'গোঁয়ার্তুমি' মনোভাব নিয়ে তিনি অফিস পরিচালনা করছেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। শুধু তাই নয়, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঘুষ হিসেবে নেওয়া বিপুল অর্থ নিয়ে এই কর্মকর্তা কক্সবাজারের বারে গিয়ে মদ পান ও আমোদ-প্রমোদে ওড়াচ্ছেন বলেও অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী একজন নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সকল বৈধ কাগজপত্র ও ডকুমেন্ট যথাযথভাবে উপস্থাপন করার পরও, এই কর্মকর্তা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে দিনের পর দিন সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন।
টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শিলখালী এলাকার সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা মো. সাইফুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমি নতুন ভোটার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব সঠিক কাগজপত্র নিয়ে এই অফিসে ১০ থেকে ১৫ বার গিয়েছি। কিন্তু আমাকে অফিসের তারেক নামে এক কর্মকর্তা ফাইল গুলো নিয়ে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে চলে যেতে বলে। প্রায় তিন মাস হচ্ছে আমার ডুকেমেন্ট নিয়েছে। প্রতিবারই কোনো না কোনো ছুতোয় আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মূলত তাদের দাবি করা ৬ হাজার টাকা ঘুষের টাকা না দেওয়ায় আমি এখনো ভোটার হতে পারিনি। অথচ যারা দালালের মাধ্যমে টাকা দিচ্ছেন, তাদের কাজ কোনো ঝামেলা ছাড়াই দ্রুত হয়ে যাচ্ছে।" আমি কেন তাদের টাকা দেব, বাংলাদেশী নাগরিক হয়ে যদি ভোটার হতে টাকা দিতে হবে।
আরেক ভুক্তভোগীর বড় ভাই টেকনাফের হ্নীলা এলাকা থেকে আসা সৈয়দ আলম বলেন- "আমার ভাইয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের একটা ছোট ভুল সংশোধনের জন্য গত দুই মাস ধরে এই অফিসে ঘুরছি। চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট, জন্ম নিবন্ধনসহ সব আসল কাগজ জমা দেওয়ার পরও নির্বাচন অফিসার একেক দিন একেক ভুল ধরেন। শেষ পর্যন্ত অফিসের পিয়নের মাধ্যমে একজন এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়। টাকা ছাড়া এখানে সাধারণ মানুষের কোনো ফাইল নড়ে না।"
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের এক বাসিন্দা তার বৃদ্ধা মায়ের এনআইডি সংক্রান্ত কাজে এসে বলেন-"মায়ের বয়স সত্তর পার হয়েছে, চোখে ভালো দেখেন না। তাকে নিয়ে তিনবার এই অফিসে এসেছি। প্রতিবারই বলা হয়-সার্ভার ডাউন বা আজ সই হবে না। কিন্তু আমাদের চোখের সামনেই দালালের নিয়ে আসা ফাইলগুলো টেবিলে জমা হওয়া মাত্রই সই হয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট এজেন্টদের মাধ্যমে ফাইল না পাঠালে এখানে শুধু সাধারণ মানুষের হয়রানিই জোটে।"
অনুসন্ধানে জানা যায়, নির্দিষ্ট কিছু দালালের সিন্ডিকেট বা এজেন্টের মাধ্যমে টেকনাফ নির্বাচন অফিসে ফাইল জমা দিলে তা দ্রুত অনুমোদন পায়। ঘুষের বিনিময়ে বিশেষ ফাইলের মাধ্যমে দ্রুত ভোটার করার এই অলিখিত নিয়ম এখন ওপেন সিক্রেট। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে উপার্জিত এই ঘুষের কালো টাকা নিয়ে নির্বাচন অফিসার সালাউদ্দিন কক্সবাজারের বিভিন্ন অভিজাত বার ও ক্লাবে গিয়ে নিয়মিত মদ্যপান ও অনৈতিক আমোদ-প্রমোদে মেতে থাকেন। একজন সরকারি দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন অনৈতিক জীবনযাপন ও সাধারণ মানুষের রক্তচোষা টাকায় বিলাসবহুল মদ্যপানের বিষয়টি এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছে।
এবিষয়ে টেকনাফের একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন- "টেকনাফ নির্বাচন অফিসের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক। একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার ভোটার হওয়া বা জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া। কিন্তু সালাউদ্দিন সাহেবের কার্যালয়ে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও সাধারণ মানুষকে মাসের পর মাস ঘোরানো হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার বিরুদ্ধে ঘুষের টাকায় বারে গিয়ে মদ খাওয়ার মতো যে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এই অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দ্রুত প্রতিকার দাবি করছি।"
অভিযোগের বিষয়ে জানতে টেকনাফ উপজেলা নির্বাচন অফিসার সালাউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমার বিরুদ্ধে আনীত অনিয়ম বা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনে এবং সঠিক তথ্য যাচাই-বাছাই করেই আমরা ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও কার্ড ইস্যু করি। টাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি উল্টো প্রতিবেদক কে বলেন- আপনারা আমাদেরকে হয়রানী করতেছেন, আমরা কি কাজ না করে চলে যাব।
তবে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই অফিসের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী জনগণ অতি দ্রুত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।